দেশের পুঁজিবাজারে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (IPO) নীতিমালা সংস্কার থমকে থাকায় বাজারে আসছে না নতুন উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান। ফলে শিল্প খাতে দীর্ঘ সময় ধরে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়ন বন্ধ রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা ভালো কোম্পানির অভাবে আগ্রহ হারাচ্ছেন, আর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ভালো কোম্পানি না থাকলে শেয়ার বাজারে প্রাণ থাকে না। অথচ গত এক দশকেরও বেশি সময় যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে, তার অর্ধেকের বেশি ছিল আর্থিকভাবে দুর্বল। এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে বহু সাধারণ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বাজারে এখন আস্থার সংকট প্রকট।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পুঁজিবাজার থেকে IPO-র মাধ্যমে কোনো অর্থই সংগ্রহ করা হয়নি। অথচ একই সময় ব্যাংক খাত থেকে শিল্প খাতে অর্থায়ন হয়েছে প্রায় ৮৩,৮৭৬ কোটি টাকা।
একইসঙ্গে, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত মাত্র ৫২টি কোম্পানি মোট ৭,৯৮০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়টিতে একটিও নতুন কোম্পানি বাজারে আসেনি।
অর্থবছর
কোম্পানি সংখ্যা
সংগ্রহকৃত অর্থ (কোটি টাকা)
২০১৯-২০
৪
৩২৭
২০২০-২১
১৫
১,২৮৬
২০২১-২২
১৫
৪,৮৪৮
২০২২-২৩
৯
৬৭৮
২০২৩-২৪
৯
৮৪১
২০২৪-২৫
০
০
গত বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠিত হয় এবং সংস্কারের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও IPO নীতিমালায় কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি। ফলে ভালো কোম্পানিগুলোকেও বাজারে আনতে পারছে না কমিশন।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনেকেই তালিকাভুক্ত হতে চায় না, কারণ তারা এতে কোনো বিশেষ সুবিধা দেখছে না। তদুপরি বাজারের নিম্নমুখী প্রবণতা এবং শেয়ারের মূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তাও উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে।
IPO নীতিমালা সংস্কারে গঠিত টাস্কফোর্স কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে:
স্টক এক্সচেঞ্জকে প্রাথমিক অনুমোদনের ক্ষমতা প্রদান
নিরীক্ষকদের মানদণ্ড কঠোর করা
IPO ভ্যালুয়েশনের জন্য শক্তিশালী মডেল তৈরি
ইস্যু ম্যানেজারদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
তবে এই সুপারিশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম জানান, শিগগিরই কমিশন তা অনুমোদন দেবে এবং নিয়ম অনুযায়ী আইন সংশোধন করা হবে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, "গত এক বছরে বাজারে কোনো আইপিও আসেনি—এটি অত্যন্ত হতাশাজনক। তবে দেরিতে হলেও যদি ভালো কোম্পানি আসে, তাহলে তা বাজারের জন্য ইতিবাচক হবে।"
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাজেদা খাতুন বলেন, "পুঁজিবাজার নিয়ে নেতিবাচক ধারণা, দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া ও ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ পাওয়া—এই তিন কারণে উদ্যোক্তারা শেয়ার বাজারে আসতে চান না। তবু আমরা চেষ্টা করছি ১০টি সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে।"
বিএসইসি সূত্র বলছে, আগের কমিশন দুর্বল কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। IPO অর্থের অপব্যবহার, কৃত্রিমভাবে শেয়ারদাম বাড়িয়ে মুনাফা তোলা, এমনকি প্লেসমেন্ট শেয়ার কারসাজিও হয়েছে। এখন কমিশন এমন একটি নীতিমালা করতে চায় যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ না থাকে।